দশকের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধি অর্জনের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করল চীন

চীন ২০২৬ সালের জন্য অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা কমিয়ে ৪ দশমিক ৫ থেকে ৫ শতাংশের মধ্যে নির্ধারণ করেছে।

কয়েক দশকের মধ্যে এটিই দেশটির ইতিহাসের সর্বনিম্ন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা। গতকাল বেইজিংয়ে অনুষ্ঠিত বার্ষিক আইনসভা ন্যাশনাল পিপলস কংগ্রেসের (এনপিসি) উদ্বোধনী অধিবেশনে এ ঘোষণা দেয়া হয়। মূলত অভ্যন্তরীণ বাজারে মন্দা এবং বিশ্বজুড়ে অস্থির পরিস্থিতির কথা মাথায় রেখেই বেইজিং এ সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নিয়েছে। খবর সিএনএন।

চীনের প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং অধিবেশনে সরকারের এ নতুন লক্ষ্যমাত্রা তুলে ধরেন। তিনি স্বীকার করেন, চীন বর্তমানে এক কঠিন ও জটিল পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। একদিকে যেমন বাইরের দেশগুলোর সঙ্গে বাণিজ্যিক টানাপড়েন চলছে, অন্যদিকে দেশের ভেতরেও নানা কাঠামোগত সমস্যা প্রকট হয়ে উঠেছে। এর আগে টানা তিন বছর চীন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ৫ শতাংশ বা এর আশপাশে নির্ধারণ করেছিল। তবে বর্তমান বাস্তবতায় সে ধারা বজায় রাখা কঠিন বলে মনে করছেন দেশটির নীতিনির্ধারকরা।

নব্বইয়ের দশকের পর চীন প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করা শুরু করে। তার পর থেকে এটিই তাদের সর্বনিম্ন লক্ষ্যমাত্রা। এর আগে ২০২০ সালে করোনা মহামারীর চরম সংকটের সময় দেশটি কোনো নির্দিষ্ট প্রবৃদ্ধির লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করেনি। অর্থনীতিবিদদের মতে, চীন এখন দ্রুত প্রবৃদ্ধির চেয়ে অর্থনীতির গুণগত মান উন্নয়নের দিকে বেশি নজর দিচ্ছে। প্রবৃদ্ধির এ মন্থর গতি মূলত দেশটির আবাসন খাতের দীর্ঘমেয়াদি সংকট এবং অভ্যন্তরীণ বিনিয়োগ কমে যাওয়ার ফল।

বিগত বছরগুলোয় চীনের অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি ছিল আবাসন খাত। তবে গত পাঁচ বছর এ খাতে বড় ধরনের মন্দা চলছে। আবাসন ব্যবসায় ধস নামার ফলে সাধারণ মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস কমে গেছে এবং তারা খরচ কমিয়ে দিয়েছে। ফলে দেশের ভেতরে পণ্যের চাহিদাও অনেক কমে গেছে।

প্রধানমন্ত্রী লি কিয়াং তার ভাষণে জানান, সরকার এখন অভ্যন্তরীণ বাজার শক্তিশালী করার ওপর সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দেবে। সাধারণ মানুষের কেনাকাটার সামর্থ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর জন্য বিভিন্ন পদক্ষেপ নেয়া হবে বলেও তিনি জানান।

তবে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি কমানোর ঘোষণা দিলেও চীন তাদের প্রতিরক্ষা বাজেটে কোনো কাটছাঁট করেনি। ২০২৬ সালে দেশটির প্রতিরক্ষা বাজেট ৭ শতাংশ বাড়ানো হয়েছে। বেইজিং তাদের সামরিক বাহিনীকে আধুনিকায়নের প্রক্রিয়া পুরোদমে চালিয়ে যাচ্ছে। নতুন যুদ্ধবিমান, বিমানবাহী রণতরী ও উন্নত ড্রোন তৈরির কাজও থেমে নেই। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, অর্থনৈতিক মন্দা সত্ত্বেও এশিয়ায় নিজেদের সামরিক আধিপত্য ধরে রাখতে বেইজিং কোনো ঝুঁকি নিতে চায় না।

কয়েক সপ্তাহের মধ্যে চীনের প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈঠক হওয়ার কথা। বেইজিংয়ে তিনদিনের এ শীর্ষ সম্মেলনে বাণিজ্য, প্রযুক্তি ও তাইওয়ান ইস্যু নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হতে পারে। এ আলোচনার ঠিক আগেই চীন তাদের এ নতুন অর্থনৈতিক লক্ষ্যমাত্রা ঘোষণা করল। অন্যদিকে মার্কিন শুল্কনীতির জবাবে চীনও এরই মধ্যে বিভিন্ন মার্কিন পণ্যের ওপর পাল্টা শুল্ক আরোপ করেছে। ফলে আন্তর্জাতিক বাজারে চীনের অবস্থান এখন বেশ শক্তিশালী।

সামগ্রিক প্রবৃদ্ধির গতি কমলেও উচ্চপ্রযুক্তি খাতে চীন অনেক এগিয়ে যাচ্ছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সেমিকন্ডাক্টর ও রোবোটিকসের মতো খাতে চীন গত কয়েক বছরে অবিশ্বাস্য উন্নতি করেছে। সরকার জানিয়েছে, তারা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি খাতে বাজেট ১০ শতাংশ বাড়াবে যাতে পশ্চিমা দেশগুলোর ওপর প্রযুক্তিগত নির্ভরশীলতা কমানো যায়। ২০৩৫ সালের মধ্যে মাথাপিছু আয় দ্বিগুণ করার লক্ষ্য নিয়েই এগোচ্ছে চীন সরকার। বেইজিংয়ের নতুন পঞ্চবার্ষিকি পরিকল্পনা মূলত এ উদ্ভাবন ও প্রযুক্তির ওপর ভিত্তি করেই সাজানো হয়েছে।

আরও